certifired_img

Books and Documents

Bangla Section (09 Jul 2019 NewAgeIslam.Com)



Defeating Islamism and Jihadism: ইসলামবাদ ও জিহাদবাদকে পরাজিত করার প্রশ্ন: শান্তি, বহুমুখী সমাজ ও লিঙ্গ বিচারের নতুন ধর্মতত্ত্ব গড়ে তুলুন,



By Sultan Shahin, Founding Editor, New Age Islam

Mr Sultan Shahin’s Speech In The 39th General Conference Of The Human Rights Council Of The United Nations (28. 10. 2018)

Development and protection of civil, political, economic, social and cultural rights

জাতিসঙ্ঘের মানবধিকার কাউন্সিল জেনেভার ৩৯ তম সাধারন সম্মেলনে (সেপ্টেম্বর ১০-২৮.২০১৮) জনাব সুলতান শাহীনের বিবৃতি :-

সাধারন বিভাগ, তালিকা নং-৩ নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতির মত সমস্থ অধিকারের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ।

সুলতান শাহীন, ফাউন্ডিং এডিটর নিউএজ ইসলাম

১৪ই নভেম্বর – ২০১৮

এশিয়ান ইউরপিয়ন হিউম্যান রাইটস ফোরামের পক্ষে-

 

মাননীয় সভাপতি,

          সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বিগত ১৭ বৎসর যাবৎ চলছে, কিন্তু ইসলামের নামে চলা সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় আমরা সফল হতে পারিনি। জেহাদী এবং ইসলামী সংগঠনগুলি এখনও মুসলিম যুবকদের কুক্ষিগত করেই চলেছে। তার কারন আন্তর্জাতিক স্তরে ইসলামিজম ও জেহাদিজম এর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে প্রয়োজন অনুযায়ী মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

অধিকাংশ মুসলিম ইসলামকেই মুক্তির মাধ্যম মনে করে। ইসলামের উদ্দেশ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা, পারস্পারিক সম্পর্ক তৈরি করা। নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক আন্দোলনের পটভূমিতে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব যা কিনা অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে তৈরি করা যাতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, অত্যুৎসাহিতা, সহনশীলতার অভাব, লিঙ্গ বৈষম্যের উপর ভিত্তি করে এক রাজনৈতিক এবং লাগামহীন লক্ষ্য হিসাবে প্রস্তুত করা হয়েছ। মাদ্রাসায় সন্ত্রাস, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, গোটা দুনিয়াকে কব্জা করার প্রবণতার উপর ভিত্তি করে ইসলামী সংবিধানের মৌলিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এথেকেই ইসলাম পরস্তীর ঝোঁক শক্তি সঞ্চয় করে। কিন্তু একত্রিতভাবে শান্তি প্রিয় মুসলমানদের এবং অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ইসলামী সন্ত্রাস সত্ত্বেও উম্মতের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এর প্রত্যুত্তর দিতে পারেনি।

একথা অনিবার্য হয়ে উঠেছে যে, যে সমস্ত মুসলিম দেশ ইউ.এন.চাটার্ডে স্বাক্ষর করেছেন তারা যথাশীঘ্র এই সমস্যার দিকে নজর দিক এবং শান্তি, সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ন্যায়ভিত্তিক ধর্মতত্ত্ব তৈরি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। প্রথমে মরক্কো এবং বর্তমানে সৌদি আরব এর মত বিভিন্ন দেশ এই পথেই এগিয়ে আসছে মনে হয়। বরং যে দেশটি এব্যাপারে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন সেটি হল তুর্কি। বিগত এক দশক ধরে ক্রমাগত সঙ্কটের পর তুর্কি আলেমগন খাঁটি দশ হাজার হাদীসের মধ্যে এক হাজার ছয়শত হাদিস নির্ধারিত করেছেন। এর মধ্যে প্রত্যেকটি হাদীসের প্রসঙ্গ নির্দিষ্ট করেছেন এবং তার উপজুক্ত অর্থও ব্যাখ্যাও প্রদান করেছেন। এই গ্রন্থ তুর্কির সবকটি মসজিদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি আশা করছি খুব শীঘ্রই এই গ্রন্থ আন্তর্জাতিক স্তরে মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব ভাষায় সহজ প্রাপ্য করে দেওয়া হবে।

বর্তমান ইসলামী ধর্মতত্ত্ব একাবিংশ শতাব্দীর মিশ্র এবং কল্পনা প্রসূত সমাজ জীবনের প্রয়োজনের সাথে সুসঙ্গত নয়। দক্ষিন এশিয়ার একজন কবি ও চিন্তাবিদ ইকবাল প্রায় একশত বছর পূর্বেই ইসলামের ধর্মীয় ধারনা ও দৃষ্টিভঙ্গির পূনঃনির্মাণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন আমাদেরও সেই পথেই কাজ শুরু করে দেওয়া উচিৎ।

কিন্তু প্রথমেই আমাদের জানা প্রয়োজন যে, বর্তমান পরিস্থিতির কারন সমূহ কী কী? কেন এমন যে, আমাদের মধ্যে ওলামায়ে কেরাম যদিও জেহাদীদের সমর্থন করেন না, কিন্তু তাদের মারাত্ত্বক ধ্বংসলীলা যাতে হাজার হাজার মুসলিমের জীবন চলে গেছে তবুও সহনশীল হয়ে আছেন। ৯/১১ –এর ধ্বংসলীলা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শহরগুলিতে হিংস্রতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কথা না হয় বাদই দিন।

স্বঘোষিত ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ যারা তাদের অত্যাচার আর হিংস্রতা আশ্চার্যজনক ভাবে সম্প্রচার করার জন্যে বিখ্যাত। ইরাক ও সিরিয়ার এলাকা থেকে যারা উৎখাত হয়েছে, কিন্তু আফ্রিকার ও দক্ষিন এশিয়ায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শক্তিশালী হতে দেখা যাচ্ছে। যদিও আল কায়দা পরাজিত হয়েছে, কিন্তু এখনও শেষ হয়ে যায় নি। তারা একনও মুসলিম যুবকদের বিভিন্ন শ্রেণীকে প্রভাবিত করছে। তালিবান যারা আফগানিস্তানে আল কায়দাকে জন্ম দিয়েছিল, আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃসংঘ এখন একথা মানতে তৈরী যে, কাবুলে প্রাশাসনিক কাজকর্মে তাদেরও অংশীদারিত্ব থাকা উচিৎ যেখান থেকে তাদের ২০১১ তে ৯/১১ দুর্ঘটনার পর উৎখাত করা হয়েছিল।

          পাকিস্তানে লস্করে তৈয়েবা জয়েশ-এ-মুহাম্মদ, আফ্রিকায় বোকা হারাম এবং আশ্ শাবাব, ইন্দোনেশিয়ায় আল জমাতুল ইসলামীয়ার মতো সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ ও দল আন্তর্জাতিক স্তরে তাদের শিকড় মজবুত করেছে।

মাননীয় সভাপতি,

          হতে পারে ৯/১১ থেকেই আন্তর্জাতিক চক্র মুসলিম সন্ত্রাসের ব্যাপারে জড়িত, কিন্তু এটার মৌলিক ভিত্তি ইসলামের ভিতরে দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আল্লাহ ও তাঁর পয়গম্বার দুজনেরই ইচ্ছে যে, মুসলমান মধ্যপন্থী, নিরপেক্ষ ও সুষম উম্মত হিসাবে গড়ে উঠুক। কুরআনের ২:১৪৩ নং এই উম্মতকে মধ্যম উম্মত বলেছেন। কুরআনের অনেকগুলি আয়াতে এবং সুনির্দিষ্ট হাদীসে মুসলমানদের কখনই সন্ত্রাসবাদী পথ গ্রহন করার নির্দেশ দেয়নি। এমনকি নামাজ ও রোজার মতো ধর্মীয় ফরয আদায় করার ক্ষেত্রেও জবরদস্তি করার কথা বলেনি। বরং নবী (সঃ) বিশেষ করে ওই লোকদের সম্পর্কে  তাঁর ক্রোধ প্রকাশ করেছেন যারা সবসময় দিনের বেলায় রোজা রাতের বেলা পুরোটা রাত নামাজ, বৈবাহিক সম্পর্ক মুক্ত জীবন এবং যৌন ক্ষুধা আয়ত্বে আনার জন্যে মাংস পরিহার করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে।

৬৩২ খৃস্টাব্দে রসূলুল্লাহ (সঃ) এর মৃত্যুর পরেই উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দিয়েছে এবং তারা নিজেরাই এই সিদ্ধান্ত নিতেও শুরু করেছে যে, কে মুসলমান আর কে মুরতাদ আর কে মুশরিক আর কে কাফের? এমনকি তারা নিজ সিদ্ধান্তেই নাস্তিক আর অপরাধীদের শাস্তি দিতে এবং হত্যা করতে শুরু করে দিয়েছে। এধরনের কাজ প্রথম শুরু করে খারেজীরা। তারাই চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাঃ) সমেত হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। আজ ইসলামের সমস্থ ফিরকার সাথে সম্পর্ক রাখা আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলিতে এমন হাজার হাজার ভিত্তি বর্ণনা করা হয়েছে যার উপর ভিত্তি করে একজন মুসলমানকে কাফের, মুশরিক, মুরতাদের স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পৃথকরূপে ওই সমস্থ মুসলমানদেরও ক্ষমতাবান বানায় যারা এই মুসলমানদের সাথে ন্যায় করতে ইচ্ছুক। যাদের সম্পর্কে এরা মনে করে যে, তারা অস্বীকার বা অন্যায় করেছে। খোদার ইনসাফ যা কেয়ামতের দিনে খোদার তরফ থেকে করার কথা সেটাই তারা এই দুনিয়াতেই করছে। যাকে ‘সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা’র মতো খোদায়ী নির্দেশের বুনিয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মগজ ধোলাই করা হয়েছে।

          কুরআন, হাদীস এবং চিরায়ত ফিকাহ সবই একথাই একমত যে, ইসলামে রাষ্ট্রের কোন পরিকল্পনা নেই। যদি কখনও কোন মুসলিম রাষ্ট্র তৈরি হয় তখন সেখানকার বৈধ সরকারই একমাত্র কোন উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়ার অধিকারি। যদিও তা অন্য কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হোক বা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে হোক তা হবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। চিরায়ত ফিকাহ শাস্ত্র অনুযায়ী কোন ব্যক্তি বা কোন জমাত (গোষ্ঠী) নিজের মর্জি মোতাবেক কোন প্রকার হিংস্রতা বা উগ্রতা প্রকাশ করার অধিকারী নয়। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর নামে বিভিন্ন প্রকার হিংস্রতার বরাত দিয়ে সহনশীলতার প্রদর্শনী করছে। একজন সন্ত্রাসী তার কাজের বৈধতার কুরআন ও হাদীসের চয়ন কৃত শব্দ উল্লেখ করছে যার সঙ্গে প্রসঙ্গের কোন সম্পর্ক থাকে না, এবং তার এই ঘৃণ্য প্রয়াস ক্ষমা করা যায় হয়। শেষ পর্যন্ত ওসামা বিন লাদেনের উপর কখনই ধর্মত্যাগ বা উদ্ধত্যের ফতোয়া লাগানো যায়নি। যেখানে ভারতবর্ষের স্যার সৈয়দ আহমেদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) এর মত বিখ্যাত ধর্মসংস্কারকের উপর দেওবন্দের ওলামা এমনকি কাবার মাতোয়াল্লী ও কাফের এবং ধর্মত্যাগীর কোটি কোটি ফতোয়া জারি করেছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই মুসলিম দেশের কোন কোন এলাকায় সংস্কারবাদী ও ভিন্ন মত পোষণকারীকে কিছু ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠী এখনও হত্যা করে চলেছে। স্বঘোষিত ইসলামি রাষ্ট্রের কর্ণধার আল বাগদাদীর এহেন বক্তব্য “ইসলাম কখনও একদিনের জন্যও শান্তির ধর্ম ছিল না” সত্ত্বেও গোটা দুনিয়ার মুসলিম ওলামাবৃন্দ মৌনতার সাথে একে স্বাগত করেছেন।

মাননীয় সভাপতি,

          এই ক্রমবর্দ্ধমান ইসলামীজমের মৌলবাদী প্রভাবে এখন কিছু উচ্চশিক্ষিত মানুষ কে একথা বলতে শোনা যাচ্ছে যে, যদি এক বৎসরে ৮৬ দেশের মাত্র তিন হাজার মুসলিম ইসলামী রাষ্ট্রে অংশগ্রহণ করে তাহলে তাতে এমন কি হয়েছে? ১.৭ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তাদের তাৎপর্য কতটা? এত ক্ষুদ্র অংশকে মৌলবাদী বৃদ্ধির প্রমান স্বরূপ কী ভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে? বিবেক স্তব্ধ হয়ে যায় যে, এধরনের চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবিদের কী উত্তর দেওয়া যায়। আসল কথা এই যে, যদি একজন মুসলমান মনে করে যে, মানব বোমা হিসাবে মসজিদে গিয়ে নামাজীসহ নিজেকে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিলে খোদার পুরস্কার পাওয়া যাবে তাহলে উম্মতকে এই মুহূর্তে অবশ্যই চিন্তা করার বিষয় এই যে, আমাদের ধর্মে এমন কি আছে যাকে ঢাল করে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো এমন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং এই জঘন্যতম অপরাধ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তারা কী এমন কান্ড করার পরেও জান্নাতে প্রবেশ করবে? উম্মতকে বিষয়টা অবশ্যই চিন্তা করার বিষয়। উম্মতকে ভাবতে হবে যে, মৌলবাদী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি হাজার হাজার সন্ত্রাসবাদী অপরাধের ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও আমরা নির্বিকার ভাবে জীবনযাপন করছি, প্রতিদিন দুনিয়ার কোন না কোন অংশে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের খবর পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু এব্যাপারে আমাদের চিন্তা-ভাবনা কোথায়? আমাদের তো নির্বিকার থাকতেই হবে।

যে ব্যক্তি পাকিস্তানী পাঞ্জাবের গভর্নর সাল্মান তাসীরকে রসুল অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত  এক খৃস্টান মহিলাকে সমবেদনা প্রকাশ করার জন্য হত্যা করেছে তাকে একজন আল্লাহর বন্ধুর মর্যদায় ভূষিত করা হয়েছে। তার ফাঁসীর পরে পাকিস্তানের বেরেলবী সূফী সম্প্রদায় তার নামে এক দরগা তৈরি করেছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ ধর্না দেয় এবং দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল প্রাপ্ত করার জন্য আল্লাহর দরবারে এই হত্যাকারীর অসীলা পেশ করে।

          ধর্মের নামে করা এই জঘন্য অপরাধকে পবিত্রতার দৃষ্টিতে দেখার ভিত্তি কী? ইসলামের নামে করা অপরাধকে বিনা চিন্তাভাবনায় সমর্থন করা এবং তার জন্য নির্বিকার হওয়ার কারন কী? মনে হয় ইসলামের পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর ইন্তেকালের দুশো বৎসর পরে খৃষ্টীয় নবম শতাব্দিতে মোতাযিলাদের পরাজিত হওয়া পরমুহূর্তেই চিন্তা-ভাবনা, বুদ্ধি-বিবেচনার পথ পরিত্যাগ করে দিয়েছে। ওলামায়ে কেরামগন মুসলমানদের ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করার কথা বলে দিয়েছে যা ইসলামে উদ্ভাবনী চিন্তার এক মৌলিক নীতি ছিল, আর তারা এটাই করল। ইজতিহাদের কার্যক্রম দ্বিতীয় খলিফায়ে রাশেদ হযরত উমর (রঃ) এর যুগ থেকেই চলে আসছিল, যিনি ইসলামের পয়গম্বর মুহাম্মদ (সঃ) এর ইন্তেকালের দু বৎসর পরেই খিলাফতের আসনে সমাসীন হয়েছিলেন।

 

মাননীয় সভাপতি,

          ইজতিহাদের (গবেষণা) পথ রুদ্ধ হওয়ার পরেও উম্মতের এক বৃহৎ অংশের মঞ্জুরি ব্যাতিরেকেই ব্যক্তিগত স্তরে ইজতেহাদের এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকল। ধর্মের মধ্যে কোন নতুন বিষয়  উম্মতের লোকেরা তখন মেনে নেয় যখন তা ওলামাদের মান্যতা প্রাপ্ত হয়। যেমন হজ যাত্রার জন্য ফটো ব্যাবহার, কুরআন তেলওয়াতের জন্য মাইক ব্যবহার, ইসলাম প্রচার ও প্রসারের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার। সুতারাং মনে হচ্ছে যে, এক দীর্ঘ এবং কষ্টকর বিতর্কের পর আমাদের ওলামায়ে কেরামগনের মধ্যে কিছু জ্ঞানগর্ভ চিন্তার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে আমাদের ওলামায়ে কেরামগনের মস্তিস্কের জানালা বন্ধ হতে যত সময় লাগে তাও হ্রাস পেতে চলেছে। উসমানী খেলাফৎ এর যুগে ইউরোপ থেকে প্রিন্টিং  প্রেস আমদানীর অনুমোদন দিতে ওলামা হযরতগনের প্রায় চার শতাব্দী সময় লেগেছে কিন্তু পাসপোর্ট  সাইজ ফোটোগ্রাফ, লাউড স্পিকার, রেডিও, টেলিভিশন এবং ইন্টারনেট এর অনুমোদন দিতে কেবল কয়েক দশক লেগেছে।

আমাদের একথা বুঝতে কঠিন হওয়া উচিৎ নয় যে, ইসলামী দুনিয়া অজ্ঞতার অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে আর গোটা দুনিয়া দ্রুতগতিতে উন্নতির সোপান অতিক্রম করছে। সিরিয়ার একজন কবি আলি আহম্মেদ সাঈদ (১৯৩০ খৃঃ) একে “অন্তর্ধান এর যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন এই অর্থে যে দুনিয়া থেকে উদ্ভাবনী সৃষ্টিশীল চিন্তার অন্তর্ধান হয়েছে”। তিউনিসিয়ার চিন্তাবিদ আব্দুল ওহাব আল্ মোয়াদ্দিব (১৯৪৬-২০১৪) ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন যে, “ইসলামী বিশ্বাসের কাঠামোয় জড়ানো আরব সভ্যতা এক বৃহৎ মৃত সভ্যতায় পরিবর্তিত হয়ে পরবে”। আল মোয়াদ্দিব ইসলামী বিশ্বাসের কোন বাধা বিঘ্নের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন? আপনি কী ধারণা করতে পারেন যে, যুগ যুগ ধরে গোটা মানব বসতির এক তৃতীয়াংশের উপর শাসনকারী উসমানী খেলাফাৎ (১৫১৭-১৯২৪) কুরআন ও হাদীসের প্রচার প্রসারের প্রয়োজনে প্রিন্টিং প্রেস এর উপরেও নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছিল আর তার কারন এই ছিল যে, মোযহাবী ওলামাগন মনে ভেবেছিলেন যে, প্রত্যেক নূতন উদ্ভাবন শয়তানের কাজ। হয়ত আমাদের ধর্মীয় ওলামাগ্ন মনে ভেবেছিলেন যে, আল্লাহ ইসলাম ধর্ম অবতীর্ণ করার পর তাঁর সৃষ্টি নৈপুণ্য হারিয়ে ফেলেছেন আর এখন কেবল শয়তানই পারে নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে। আসলে আমাদের ওলামাদের তো ধারণা এই যে, কুরআন ও আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং এটা সৃষ্টি বিহীন এবং আদি ও অন্তহীন, লৌহে মাহফুজে অনন্তকাল ধরে অবস্থিত। আল্লাহ কেবল প্রথম থেকে অস্তিত্ত সম্মপন্ন কুরআনকেই ইসলামের পয়গম্বরের মাধ্যমে খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দিতে মানুষের উপর অবতীর্ণ করেছেন। কুরআন সৃষ্ট এই এই সমস্যা এক বড় সমস্যার আকার ধারন করে। যার ফলে খৃষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে ওলামাগণের মধ্যে এক মস্তবড় বিতর্ক সৃষ্টি হয় যার ফলস্বরূপ মো’তাযিলা সম্প্রদায়ের ওলামাগন পরাজিত হন। মো’তাযিলাগন বলেছিলেন যে, কুরআনকে আল্লাহপাক এক বিশেষ মুহূর্তে সৃষ্টি করেছেন এবং এই কুরআন মুহাম্মদ (সঃ) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর সপ্তম শতাব্দীর প্রথমভাগে আরব যুগের পরিবর্তিত অবস্থার পতিপ্রেক্ষিতে মুসলমান এবং মুহাম্মদ (সঃ) কে পথনির্দেশ দেওয়ার জন্য সময় সময় অবতীর্ণ  আয়াতগুলির সমষ্ঠী। সুতারাং এমন অনেক আয়াত আছে যা এক বিশেষ প্রসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত, অন্য প্রসঙ্গের সাথে তাঁর তুলনা করা যায় না। কিন্তু রক্ষনশীল এবং শাব্দিক সংরক্ষনশীল ওলামাবৃন্দ একে স্বীকার করেননি। তারা বললেন, কুরআনও খোদার মতই একক এবং এর উদাহরণও স্থায়ী এবং অনন্ত। আল্লাহ কুরআনকে কেবল অবতীর্ণ করেছেন। পরিবর্তিত অবস্থা অনুযায়ী একে সৃষ্টি করেননি, আর এর লাভ এটাই যে, এর সমস্ত আয়াত অনন্তকালের জন্য লাভদায়ক।

এমনকি ইমাম আবুল হাসান আল আশয়ারী যিনি একজন মো’তাযেলী আলেম ছিলেন, তিনিও চল্লিশ বৎসর বয়সে রক্ষনশীলদের শিবিরে যোগ দিলেন, যদিও তিনি তাঁর উত্তরদাতাদের মধ্যে প্রমাণীকরন সমর্থন মো’তাযিলাদের হাম্বলী চিন্তাধারার পাঠশালায় নিজের দাবির সমর্থনে বুদ্ধি নির্ভর প্রমান দেওয়ার অনুমোদন ছিল না। সুতারাং মো’তাযিলাদের শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হাম্বলী এবং আশায়ারীগন নিজেদের এক আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি করে নিলেন।

কোরআন সৃষ্ট নয় একথার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, কুরআনের ওই সমস্থ ঘটনা এবং প্রেক্ষাপট যে কারনে সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে আরবে ইসলামের পগম্বর ও তাঁর সাহাবীদের ধর্মীয় এবং প্রচার প্রসারের প্রচেষ্টার পথ নির্দেশের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল তা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। এবং প্রথম থেকে এই ঘটনা এবং অবস্থার পরিকল্পনা এজন্যে নির্ধারিত ছিল যে, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পায়। তাঁর এটাও উদ্দেশ্য ছিল যে, যারা ইসলামের পয়গম্বরকে সাহায্য ও সহানুভুতি করেছেন তাঁদের কাজই এটাই ছিল। আর যারা মনে প্রানে ইসলামের পয়গম্বরের বিরোধিতা করেছে, এমনকি তাঁকে হত্যার চেষ্টাও  করেছে তারা কেবল খোদার ইচ্ছার প্রতিফলন করেছিল তাহলে কিভাবে প্রথম থেকেই মজুত কোন কুরআন অবতীর্ণ করা যায়?

            ইসলামের এই বোধ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, দুনিয়ায় ভালমন্দ যা কিছু তা প্রথম থেকেই নির্ধারিত। মো’তাযিলা ওলামাদের আপত্তি এটাই ছিল যে, তাহলে সবই যখন নির্ধারিত তখন পূন্য বা শাস্তির অর্থই বা কী? যদি খোদা মানুষকে সেই কর্মের শাস্তি দিতে থাকেন যা তিনি নিজেই নির্ধারণ  করে রেখে ছিলেন। তাহলে, খোদা ন্যায় বিচারক, দয়াবান, করুণাময় কীভাবে হতে পারেন? ধর্মীয় ব্যাপারে জ্ঞান ও যুক্তির বিরধীতাকারী হাম্বলী, আশয়ারী, মাতরিদী, জাহিরী, মুজাসসেমী এবং মুহাদ্দিসীন সবাই বলেছেন খোদা সর্বশক্তিমান। যা চান তাই করেন। তাঁদের ধারণা ন্যায় ও চারিত্রিক নিয়মকানুন খোদার প্রতি আরোপ করলে তাঁর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করার সমার্থবোধ হবে, এরকম করা যায় না। খোদা ন্যায়বান নন আর না বুদ্ধিমান, তিনি কেবল নিজ কুদরত এবং নিজ ইচ্ছার প্রতিক, তিনি যা চান তাই করেন। খোদা বিশ্বের এমন এক প্রথম কারন যার অন্য কোন কারন নেই। খোদা যখন কিছু করতে চান তখন তাঁর জন্য না কোন কারন থাকে আর না কোন উস্কানিদাতা , বাস্ তাঁর ইচ্ছা হয় এবং তিনি করে ফেলেন।

অষ্টম ও নবম খৃস্টাব্দে ফকীহগনের বিতর্কে দুপক্ষই বার বার কুরআনের আয়াতকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার  করেছেন। যুক্তিতর্ক বিরধী দলেরাও হাদীস (যাকে নবী করীম (সঃ) এর কথা মনে করা হয়, যদিও তা রসূলের মৃত্যুর তিন শতাব্দী পরে সংকলন করা হয়েছিল) থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই বিতর্কে কুরআনের কিছু আয়াতেরও উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে যেগুলো এই বিবৃতির শেষে  দেখা যেতে পারে।

বুদ্ধিজীবির দল মো’তাযিলা সম্প্রদায়ের পরাজয়ের পর এবং তাদের পুস্তকগুলি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর দেড় শতাব্দী পরে (১০৫৮-১১১১) ইমাম গাযযালী  হাম্বলী, আশয়ারী, এবং মাতুরিদী মতবাদের ঐক্যমত্যার পদ্ধতি এমনভাবে উপস্থাপন করলেন এবং নিম্নলিখিত কথাগুলি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করলেন-

“এরা জাহান্নামেই থাকুক কুছ পরোয়া নেই

ওরা জান্নাতেই থাকুক আমার কিছু এসে যায় না।’’

এই চিন্তাধারা এবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Incoherence or the incoherence এ বাতিল করেছেন। এতে ঈমাম গাযযালীর গ্রন্থ Thafatil Phalasipah চিহ্নিত অস্বীকৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু ইবনে রুশদের গ্রন্থগুলি মুসলিম স্পেনে (১১৯৫ খৃস্টাব্দে) পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে দেশ থেকে বিতারিত করা হয়েছিল। তাঁর কিছু গ্রন্থ কেবল এজন্যেই সংরক্ষিত ছিল কারন সেগুলোর অনুবাদ ইউরোপীয় ভাষায় পূর্বেই সম্পন্ন করা হয়েছিল, যদিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা ১২৭০ এবং ১২৭৭ খৃষ্টাব্দে ক্যাথলিক চার্চগুলি করেছিল। চার্চের বিরোধিতা সত্ত্বেও ইউরোপীয় খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে তার  গ্রহণযোগ্যতার সবচেয়ে বড় কারন “Unity of the intellect.” এর উপরে তাদের চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, যার দাবী এই ছিল যে, সমস্ত মানুষের বুদ্ধি একই রকম। যার ফলে ইউরোপের দ্বিতীয় রেনেসাঁর উদ্ভাবন হয়েছিল আর মুসলিম দুনিয়া নিজেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছিল যেখান থেকে তারা এখনও বের হতে পারেনি।

                                                                                                          

মাননীয় সভাপতি,

কুরআন অ হাদীসের যুক্তি ও প্রজ্ঞার আলোকে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে এর শাব্দিক অর্থ  ফকীহদের দৃষ্টিভঙ্গির স্তরে হিংস্রতা, পরশ্রীকাতরতা, ক্ষমহীনতা বর্ণবৈষম্যের গ্রহণযোগ্যতা সাধারন ঘটনায় পর্যবেসিত হয়ছে। বিংশ শতাব্দীতে হাসান আলবেনা, সৈয়েদ কুতুব, সৈয়েদ আবুল আলা মওদূদী এবং পরবর্তীতে আলকায়েদা এবং জয়েশের মত জমাতগুলির দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিক ফিকাহকেও অতিক্রম করে গেছে। যারা দ্বীনের এমন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে যাতে এই দুনিয়ায় ইসলামকে বিজয়ী বানানোর জন্য মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্বের নামে নিশ্ছিদ্র এবং নিষ্ঠুর সন্ত্রাসবাদকেও বৈধতার ফতোয়া বের করা হয়েছে। আজকে অমুসলিম সংখ্যাধিক্য পশ্চিমা দেশগুলির মসজিদগুলিতে ইমাম অমুসলিমদের উপর অভিসম্পাত করে এবং জুম্মার খোতবায় (শুক্রবারের সাপ্তাহিক ভাষণ) তাদেরকে ধ্বংস করার এবং ইসলামের বিজয় কামনা করে প্রার্থনা করে। সপ্তম শতাব্দীর যুদ্ধ পরিস্থিতির আরবী মস্তিষ্ক এখনও জীবিত। শাস্ত্রীয় বিচার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নির্দেশে জেহাদ বা কেতালকে ফরজে কেফায়া বলে গন্য করা হত। অর্থাৎ এটা এমনই এক ধর্মীয় দ্বায়িত্ব যেটা উম্মতের কিছু মানুষ যদি স্বেচ্ছায় পালন করত তাহলে অন্যদের উপর দ্বায়িত্ব আদায় হয়ে যেত।

বাংলা অনুবাদ

ওয়ালিউর রহমান চাঁদপুরি

URL for English article: http://www.newageislam.com/radical-islamism-and-jihad/defeating-islamism-and-jihadism--evolve-a-new-theology-of-peace,-pluralism-and-gender-justice,-sultan-shahin-asks-muslim-states-at-unhrc-in-geneva/d/116379

URL: http://www.newageislam.com/bangla-section/sultan-shahin,-founding-editor,-new-age-islam/defeating-islamism-and-jihadism---ইসলামবাদ-ও-জিহাদবাদকে-পরাজিত-করার-প্রশ্ন--শান্তি,-বহুমুখী-সমাজ-ও-লিঙ্গ-বিচারের-নতুন-ধর্মতত্ত্ব-গড়ে-তুলুন,/d/119123

New Age Islam, Islam Online, Islamic Website, African Muslim News, Arab World News, South Asia News, Indian Muslim News, World Muslim News, Women in Islam, Islamic Feminism, Arab Women, Women In Arab, Islamophobia in America, Muslim Women in West, Islam Women and Feminism





TOTAL COMMENTS:-    


Compose Your Comments here:
Name
Email (Not to be published)
Comments
Fill the text
 
Disclaimer: The opinions expressed in the articles and comments are the opinions of the authors and do not necessarily reflect that of NewAgeIslam.com.

Content